মাদ্রাসা বোর্ডে পাসের হার বেড়েছে

মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম পরীক্ষায় এবার গড় পাসের হার ৭৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ। গতবারের চেয়ে বেড়েছে ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ। গতবার পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ২ শতাংশ। এ পরীক্ষায় এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১ হাজার ২৪৪ জন। গতবার পেয়েছিলেন ১ হাজার ৮১৫ জন।

এ বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৯৭ হাজার ৭৯৩ জন। পাস করেছেন ৭৬ হাজার ৯৩২ জন। আজ প্রকাশিত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ দুপুরে মন্ত্রণালয়ের সভা কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ফলাফলের বিস্তারিত তুলে ধরেন।

ইত্তেফাক

যে কারণে ফল খারাপ

গতবারের মতো এবারও ফল খারাপের জন্য বেশকিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হলো— নতুন পদ্ধতিতে খাতা মূল্যায়ন, ইংরেজি বিষয় ও মানবিকে খারাপ করা।

সংশ্লিষ্টদের অভিমত, নতুন পদ্ধতিতে খাতা মূল্যায়ন করায় শিক্ষকদের নিজেদের ইচ্ছেমতো নম্বর বাড়িয়ে দেয়ার সুযোগ ছিল না। এ কারণে খাতার প্রকৃত মূল্যায়ন হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, ‘বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খাতা মূল্যায়ন করায় পাসের হার কমেছে। সকল খাতা সঠিকভাবে মূল্যায়িত হয়েছে। যা বাস্তব, যা সত্য সেই ফল বেরিয়ে এসেছে।’

নতুন এই পদ্ধতিতে প্রশ্নের একটি সাধারণ উত্তরও প্রস্তুত করে পরীক্ষকদের দেওয়া হয়। এটাকে মানদণ্ড ধরে শিক্ষকরা নম্বর দিয়ে থাকেন। এবার ইংরেজি বিষয়েও খারাপ করেছে শিক্ষার্থীরা। বিষয়ভিত্তিক পাসের হার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেখানে ঢাকা বোর্ডে বাংলায় পাস করেছে ৬৫ দশমিক ৯২ শতাংশ সেখানে ইংরেজিতে পাস করেছে ৭৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। যশোর বোর্ডে বাংলায় পাস করেছে ৯৩ শতাংশের বেশি। কিন্তু এই বোর্ডে ইংরেজিতে পাস করেছে ৬৫ শতাংশ। অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে তুলনামূলক আইসিটিতেও খারাপ করেছে শিক্ষার্থীরা। এবার দিনাজপুর বোর্ডে পাস করেছে ৬০ দশমিক ২১ শতাংশ। যা সার্বিক ফলে প্রভাব ফেলেছে।

শিক্ষার্থীদের মানবিকে খারাপ করাও সার্বিক ফলে প্রভাব ফেলেছে। এবার বিজ্ঞানে পাস করেছে ৭৯ দশমিক ১৪ শতাংশ। আর ব্যবসায় পাসের হার ৬৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ। অথচ মানবিকে পাসের হার ৫৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ। মানবিকে প্রায় অর্ধেক ছাত্র ফেল করেছে।

আন্তঃশিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মু. জিয়াউল হক সাংবাদিকদের বলেছেন, বিজ্ঞানের সব কয়টি বিষয়ে পরীক্ষা কঠিন হয়েছে। একই সঙ্গে আইসিটি পরীক্ষা তুলনামূলক কঠিন হয়েছে।

ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত দুই বছরের তুলনায় এবার ভালো ফল করেছে কুমিল্লা বোর্ড। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছরের মত এবারও কুমিল্লা বোর্ড খারাপ করলে সব বোর্ডের পাসের হার আরো ৫-৬ শতাংশ কমে যেত।

ইত্তেফাক

পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় তাপপ্রবাহ কমতে পারে

কুমিল্লা, নোয়াখালী, সন্দ্বীপ ও সীতাকুণ্ড অঞ্চলসহ ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের উপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের যে তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে তা প্রশমিত হতে পারে। সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা ১ থেকে ৩ ডিগ্রী সে. এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য হ্রাস পেতে পারে।

আজ সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী, ঢাকা ও খুলনা বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ী দমকা হাওয়া ও বিজলী চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে।

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় একটি লঘু চাপের সৃষ্টি হয়েছে। মৌসুমি বায়ুর অক্ষ ভারতের রাজস্থান, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, বিহার, গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ এবং লঘুচাপের কেন্দ্রস্থল বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল হয়ে উত্তরপূর্ব দিকে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত। মৌসুমি বায়ু দেশের উপর মোটামুটি সক্রিয় এবং এটি উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় বিরাজ করছে।

আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত সন্ধ্যা ৬টা ৪৭ মিনিটে। আগামীকাল সূর্যোদয় ভোর ৫টা ২৩ মিনিটে।

ইত্তেফাক

চট্টগ্রামে দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কোতোয়ালী থানার দুই কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন- সিআরবি পুলিশ ফাঁড়ির এসআই গোলাম ফারুক ভুঁইয়া ও এএসআই ফয়সাল মুরাদ। নগরীর স্টেশন রোডে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের নিয়ন্ত্রিত মোটেল সৈকতে চাঁদা দাবিসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাদের প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে সিএমপি‘র একটি সূত্র জানিয়েছে। তবে কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহসীন প্রশাসনিক কারণে দুই পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে ইত্তেফাককে জানিয়েছেন।

সূত্র জানায়, নগরীর স্টেশন রোডে মোটেল সৈকতে পর্যটন কর্পোরেশনের নিয়মকানুন মেনে এবং সরকারি বিধি বিধান অনুসরণ করে দু’টি স্পা পার্লার চলে আসছে। গত ৪ জুলাই কোতোয়ালী পুলিশ পার্লার দু’টিতে অভিযান চালিয়ে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ১৪ তরুণী ও ৮ যুবককে ধরে নিয়ে যায়। অভিযোগ পাওয়া গেছে, অভিযানের সময় এসআই গোলাম ফারুক ভুঁইয়া ও এএসআই ফয়সাল মুরাদ পার্লার দু’টির মালিকের কাছে একলাখ টাকা দাবি করেন।

টাকা দাবির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে কোতোয়ালীর ওসি মো. মহসীন বলেন, এ ব্যাপারে কেউ অভিযোগ করেনি। অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পেয়েই আমরা সেখানে অভিযান চালিয়েছি।

জানা গেছে, এ অভিযান নিয়ে পুলিশের মধ্যে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পুলিশের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি অনুসন্ধানের পর সত্যতা পাওয়ায় এসআই গোলাম ফারুক ভুঁইয়া ও এএসআই ফয়সাল মুরাদকে শাস্তিমূলক প্রত্যাহার করা হয় বলে সূত্রটি জানায়।

ইত্তেফাক

খালেদা জিয়া বিহীন নির্বাচন প্রতিরোধ করবে বিএনপি

দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘প্রতিরোধের ঘোষণা’ দিয়েছে বিএনপি। একইসঙ্গে মুক্ত খালেদা জিয়াকে নিয়েই নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন দলটির নেতারা। তারা বলেছেন, খালেদা জিয়াকে ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হবে না, হতে দেয়া হবে না। প্রতিহত করা হবে।

শুক্রবার বিকালে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও চিকিৎসার দাবিতে এক বিরাট সমাবেশে বিএনপি নেতারা এসব কথা বলেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নির্বাচনের এক নম্বর শর্ত হচ্ছে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। তাকে কারাগারে রেখে কোনো নির্বাচন হবে না। দেশের মানুষ তা হতে দেবে না।নির্বাচনের আগে বর্তমান সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে, নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দিতে হবে, নির্বাচনে কিছুদিনের জন্য ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েন করতে হবে।নির্বাচন কমিশনকে পুনর্গঠন করতে হবে।

সমাবেশকে কেন্দ্র করে দুপুর ১ থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে উপস্থিত হতে থাকে বিএনপির ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ সময় নেতাকর্মীরা মিছিল থেকে মুক্তি মুক্তি মুক্তি চাই, খালেদা জিয়ার মুক্তি চাইসহ বিভিন্ন স্লোগানে রাজপথ মুখরিত করে তোলেন। অপরদিকে বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র বিএনপি অফিস, পল্টন মোড়, ফকিরাপুল মোড়সহ এর আশপাশের এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। পাশাপাশি সাদা পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়। দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে সমাবেশ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় এবং সোয়া পাঁচটার দিকে শেষ হয়। বিএনপির সমাবেশকালে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের দু’টি সড়কে গাড়ি চলাচলও বন্ধ ছিল। এতে আশেপাশের এলাকায় দীর্ঘ যানজট তৈরি হয় এবং এ এলাকা দিয়ে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগে পড়তে হয়।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা সমাবেশস্থলে আসেন। কিছু শর্ত সাপেক্ষে সমাবেশের অনুমতি পেলেও সময় স্বল্পতার কারণে মঞ্চ তৈরির সুযোগ পায়নি বিএনপি। ফলে খোলা ট্রাকের ওপর মঞ্চ তৈরি করে নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন। ফকিরাপুল থেকে কাকরাইল পর্যন্ত সমাবেশের বিস্তৃতি ঘটে।

মির্জা ফখরুলের সভাপতিত্বে সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. মঈন খান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, এজেডএম জাহিদ হোসেন, আমান উল্লাহ আমান, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, জয়নুল আবেদীন ফারুক, রুহুল কবির রিজভী,সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, নিতাই রায় চৌধুরী, কাজী আবুল বাশার, উত্তরের সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ হাসান, অধ্যক্ষ সেলিম ভূইয়া, আব্দুল সালাম আজাদ,শফিউল বারী বাবু,আব্দুল কাদির ভূইয়া জুয়েল,রাজিব আহসান, আকরামুল হাসান মিন্টু,হেলাল খান প্রমুখসহ দলটির অঙ্গ-সংগঠনের নেতারা বক্তব্য রাখেন।

মির্জা ফখরুল সরকারের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা সকল দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন করতে চান না, কারণ আপনারা জানেন নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করলে আপনাদের পরাজয় সুনিশ্চিত।সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এবং সেই নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে আওয়ামী লীগ ২০টা আসনও পাবে না।
সরকার খালেদা জিয়াকে ভয় পান বলেই তাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার ষড়যন্ত্র করছে বলেও অভিযোগ করে ফখরুল বলেন, তাকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়া হচ্ছে জনগণের প্রতিনিধি, তাকে জেলে রেখে এ দেশে কোন নির্বাচন জনগণ হতে দেবে না। বিশেষ করে খালেদা জিয়া কারাগারে থাকলে নির্বাচন হতে দেয়া হবে না। বামপন্থী আটটি দলের নতুন জোটকে স্বাগত জানিয়ে বিএনপির চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া ‘জাতীয় ঐক্যে’ তাদেরকেও শামিল হওয়ার আহ্বান জানান ফখরুল।

তিনি বলেন, দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে অন্যান্য সব দলকে নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।গণতন্ত্রের জন্য, মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য এবং সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সমস্ত দল ও সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বর্তমান সরকারের দুঃশাসন যেভাবে বুকে চেপে আছে, তার থেকে মুক্তির জন্য জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন।এই সরকারের হাত থেকে জনগণকে মুক্ত করতে হবে। এ জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দেশকে রক্ষার জন্য, আমাদের ওপর যে দুঃশাসনের পাথরের মতো বসে আছে তা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন সংগ্রাম করতে হবে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সংসদে বললেন কোটাই থাকবে না, এটা বাতিল। পরে দেখা গেল উল্টো আন্দোলনকারীদের মিথ্যা মামলায়, গুম করে, মাথা মুড়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছে। পরিস্থিতি এতোটাই খারাপ অবস্থায় গেছে, বিদেশি দূতাবাসও এগুলো বন্ধ করতে বলছে। দেশের প্রতিটি মানুষ ভয়ে আছে মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, জনগণ জানে না, কখন যে তারা গুম হয়ে যায়। কোটা আন্দোলনকারীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মিথ্যা মামলা দেয়া হচ্ছে। তাদের কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। নির্যাতন করা হচ্ছে।

কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার সমালোচনা করে ফখরুল বলেন, আজকে ছাত্রলীগের ভূমিকা খান সেনাদের ভূমিকার চেয়েও ভয়াবহ। আজ যারা কোটার জন্য আন্দোলন করছে তাদের মায়েরা বলছে আমার ছেলের চাকরি চাইনা, আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও। বাংলাদেশ আজ কেউ নিরাপদ নয়। আমরা এই অবস্থার পরিবর্তন চাই।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, দেশের সমস্ত ব্যাংক লুট করা হয়েছে, এমনকি বাংলাদেশে ব্যাংকে আসল সোনাকে নকল সোনায় রূপান্তরিত করছে।দেশে কোন বিদেশি বিনিয়োগ নাই, চাকরি নাই। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতির চরম খারাপ অবস্থা এখন। সরকারের সে দিকে নজর নাই, নজর হলো যারাই বিরোধিতা করবে তারকেই জেলে ভরতে হবে। জামিন পাওয়ার কথা, জামিন নাই, উল্টো অন্যান্য মিথ্যা মামলায় আটক করা হচ্ছে নেতাকর্মীদেরকে।

তিনি বলেন, আমরা এমপি মন্ত্রী হওয়ার জন্য আন্দোলন করছি না, এ দেশের মানুষের অধিকার ফিরে পেতে আন্দোলন করছি। কিন্তু সেই আন্দোলন করতে আপনারা দেবে না, দিলে সত্য বেরিয়ে আসবে। তখন আপনাদের অস্তিত্ব থাকবে না।ফখরুল বলেন,দেশে এখন একটা ভয়াবহ পরিস্থিতি চলছে, ত্রাসের ভয়ের রাজত্ব তৈরি হয়েছে। দেশে এখন প্রত্যেক মানুষ অনিরাপদ।৭৮ হাজার মামলায় বিএনপির ১৮ লাখ নেতা-কর্মীকে আসামি করা, প্রায় ৫০০ নেতাকে গুম করা হয়েছে।

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, খালেদা জিয়াকে বাইরে রেখে আরেকটি প্রহসনের নির্বাচন করতে চায় সরকার। প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করে তারা ক্ষমতায় আসতে চায়। তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হবে না, হতে দেয়া হবে না,প্রতিহত করা হবে। তার মুক্তি না হলে দেশে কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে না। বিদেশিরা বলেছেন, দেশের মানুষ বলছেন- বিএনপি ও খালেদা জিয়াকে ছাড়া অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে পারে না।

আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন হতে দেয়া হবে না ঘোষণা দিয়ে ড. মোশাররফ বলেন, নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে, নেতাকর্মীদের মুক্তি দিতে হবে এবং মিথ্যা মামলা তুলে নিতে হবে।

ব্যরিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন,বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্য চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার একটি সুযোগ এসেছে। আর তা হলো এই সরকারের পতন ঘটানো।আগামীতে জনসভা করার জন্য আমরা কোন অনুমতির অপেক্ষায় বসে থাকব না। কর্মসূচি দেবো এবং তা বাস্তবায়িত হবে।মওদুদ আহমদ বলেন, এ দুঃশাসন থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। যদি আইনি প্রক্রিয়ায় সম্ভব না হয় তাহলে রাজনৈতিকভাবেই খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে।

মির্জা আব্বাস বলেন, খালেদা জিয়াকে নিয়ে নির্বাচনে যাব। কেউ যদি মনে করেন ফাঁকা মাঠে গোল দিবো তা দিতে দেয়া হবে না। তিনি বলেন, বৃহত্তর আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হন। সে আন্দোলনে বিএনপির সিনিয়র নেতারা সামনে থাকবে। আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়া মুক্ত হবে।

ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, সরকার যে কৌশল নিয়েছে তা হচ্ছে খালেদা জিয়াকে বন্দি রেখে তারা একটি পাতানো নির্বাচন করতে চায়। আমরা স্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছি, খালেদা জিয়াকে বন্দি রেখে সরকারের পাতানো নির্বাচন করার পরিকল্পনা কোনদিনই সফল হবে না
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন,যতক্ষণ পর্যন্ত না খালেদা জিয়া মুক্তি পায়, বিএনপি ততক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচনে যাবে না।

অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, এই সরকার আবারও ভোট ডাকাতি, ব্যাংক ডাকাতি ও রক্তাক্ত বাংলাদেশ করতে চায় কিন্তু এবার সেই সুযোগ তাদের দেয়া হবে না।
মঞ্চে বসা নিয়ে মাথা ফাটলো ছাত্রদল নেতার

সমাবেশ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার আগেই ট্রাকের ওপর স্থাপিত মঞ্চে বসা নিয়ে নেতাকর্মীদের ভেতর হুড়াহুড়ি শুরু হয়। একপর্যায়ে আব্বাস আলী নামে এক ছাত্রদল নেতার মাথা ফেটে রক্ত বের হতে দেখা গেছে। পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখা যায়।

ইত্তেফাক

এই রাহুলকে কেউ দেখেনি আগে!

এই রাহুল গান্ধীকে আগে কেউ দেখেনি। কংগ্রেস সভাপতি যে এমন করতে পারেন, কারও কল্পনাতেও তা আসেনি। শুক্রবার ভারতীয় সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় সরকারের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার মধ্যে ভাষণ শেষে রাহুল যা করলেন, তা ছিল তাক লাগানো। ভারতীয় সংসদের ইতিহাসে সম্ভবত বিরলতম ঘটনা।

কংগ্রেসের পক্ষে রাহুলই ছিলেন প্রথম বক্তা। দুধসাদা কুর্তা পরে তাঁর ঠিক উল্টো দিকে বসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গত চার বছরে মোদি সরকারের গৃহীত বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনার মধ্যে রাহুল বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমার চোখে চোখ রাখতে পারছেন না। সম্ভবত তাঁর সংকোচ হচ্ছে। আমি জানি, আপনি আমাদের সহ্য করতে পারেন না। আমাকে পাপ্পু বলেন। ঘৃণা করেন। অনেক রাগ আমাদের ওপর। আমরা কিন্তু আপনাদের ওপর ক্ষিপ্ত নই। বরং আপনাদের ভালোবাসি। কৃতজ্ঞও। কারণ, প্রধানমন্ত্রীজি আপনি, আপনার দল বিজেপি এবং আরএসএস ভারতের আসল চরিত্র কী রকম তা আমাদের আরও ভালোভাবে বুঝতে শিখিয়েছেন। আপনাদের মনে যে হিংসা রয়েছে, আমরা তা ভালোবাসায় পরিবর্তন করব। আমরা কংগ্রেস।’

প্রায় এক ঘণ্টা ধরে মোদি সরকারকে তুলোধোনা করে ভাষণ শেষে রাহুল নাটকীয়ভাবে গটগট করে ট্রেজারি বেঞ্চের দিকে এগিয়ে যান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দিকে বাড়িয়ে দেন হাত। রাহুল দাঁড়িয়ে মোদির আসনের সামনে। প্রসারিত হাত ধরে ফেলেছেন মোদি। আচমকাই রাহুল প্রধানমন্ত্রীকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। ঘটনার আকস্মিকতায় গোটা কক্ষ হকচকিত। রাহুল ফিরে যাচ্ছেন তাঁর আসনের দিকে। মোদি তাঁকে কাছে ডাকলেন, হাত মিলিয়ে পিঠ চাপড়ে কিছু একটা বললেন। রাহুল ফিরে এলেন নিজের আসনে।

গোটা ভাষণে যেভাবে নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর সরকারকে রাহুল আক্রমণ করে গেলেন, তেমন আক্রমণাত্মক কেউ কখনো তাঁকে দেখেনি। নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত, তড়িঘড়ি জিএসটি চালু, কর্মসংস্থানে ব্যর্থতা, কালাটাকা দেশে ফেরানো ও প্রত্যেকের ব্যাংক খাতায় ১৫ লাখ টাকা জমা দেওয়ার ভুয়া প্রতিশ্রুতি, তিন গুণ বেশি দাম দিয়ে ফ্রান্সের সঙ্গে রাফায়েল যুদ্ধবিমান চুক্তি, হাতে গোনা কিছু শিল্পপতির স্বার্থ দেখে কৃষকের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে সরকারকে তুলোধোনা করে রাহুল বলেন, পররাষ্ট্রনীতিতেও এই সরকার চূড়ান্ত ব্যর্থ। ভারত, ভুটান ও চীন সীমান্তে ডোকলামে চীনা অনুপ্রবেশের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই ঘটনার পরেই মোদি চীন সফরে যান। সে দেশের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কোনো রকমের অ্যাজেন্ডা ছাড়াই দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন অপদার্থতা ঢাকা দিতে! বিজেপির নীতিকে আক্রমণ করে রাহুল বলেন, ওরা হিংস্র। আক্রমণাত্মক। ওদের বুকে ঘৃণা। আমরা বিরোধীরা এবং আমাদের সঙ্গে শাসক দলেরও অনেকে মিলে এই সরকারের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দেব।

মাত্র কিছুদিন আগেই রাহুলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ক্ষমতা থাকলে লিখিত ভাষণ পাঠ না করে ১৫ মিনিট বক্তৃতা দিয়ে দেখান। সেটা করতে পারলে ভূমিকম্প দেখা দেবে। শুক্রবার লোকসভায় রাহুল সেটাই করে দেখালেন। তাঁর ভাষণের সময় শাসক দলের সমবেত বিরোধিতার মধ্য দিয়েও এটা স্পষ্ট হয়ে গেল, আগামী নির্বাচনে কংগ্রেসই হতে চলেছে বিজেপির প্রবল প্রতিপক্ষ এবং মোদির লড়াইটা রাহুলেরই সঙ্গে। কংগ্রেস নেতা শশী থারুরও তাই টুইট করে বললেন, বাস্তবিকই এটা পালাবদলের ভাষণ। ভূমিকম্প এসে গেছে।

খুশি সোনিয়া গান্ধীও। সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আমি খুব খুশি। আরও খুশি প্রচারমাধ্যমের মনোভাব বদলাচ্ছে দেখে।’

সিলেটে বিএনপির ভিন্ন কৌশল

• বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী বদরুজ্জামানের সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা
• বদরুজ্জামানের সিদ্ধান্তে বিএনপির অবস্থান শক্ত হয়েছে
• এখন বিএনপির দুশ্চিন্তা সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে

খুলনা ও গাজীপুরে ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী কৌশল থেকে সিলেটে তা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠন ও পোলিং এজেন্ট নিয়োগে স্থানীয় প্রভাবশালীদের রাখছে। একই সঙ্গে এজেন্টদের যাতে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাড়িয়ে দিতে না পারে, সে জন্য নেতা-কর্মীদের একটি অংশকে ভোটকেন্দ্রের আশপাশে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে আরিফুল হক চৌধুরীর সমর্থনে গতকাল বৃহস্পতিবার বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মো. বদরুজ্জামান সেলিম নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। দলটির নেতারা বলছেন, এতে সিলেটে বিএনপির অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে। এর ফলে পোলিং এজেন্ট নিয়োগ, ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়াসহ নির্বাচনের কৌশল নিয়ে বিএনপি যে ছকে এগোচ্ছে, তার বাস্তবায়ন আরও সহজ হবে। তবে এখন তাদের দুশ্চিন্তা সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে।

বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা মনে করছেন, বদরুজ্জামান সেলিম এত দিন মাঠে থাকায় তা সরকারি দলের জন্য সুবিধাজনক ছিল। তিনি নির্বাচনে থাকলে ভোট যা-ই পেতেন না কেন, আরিফুল হক পরাজিত হলে বলা যেত বিএনপি দলীয় কোন্দলে হেরেছে। এখন সেই সুযোগটি আর থাকল না। এখন ক্ষমতাসীনেরা বিএনপির ওপর অসহিষ্ণু হয়ে উঠতে পারে। গতকাল বদরুজ্জামান সেলিম নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণার আগে ও পরে পুলিশের আচরণ দেখে বিএনপির নেতারা এমন আশঙ্কা করছেন। যদিও এখন পর্যন্ত সিলেটের নির্বাচনী পরিবেশ অন্য সিটির চেয়ে অনেক ভালো। রাজনৈতিক সহাবস্থান এখনো বজায় আছে।

অবশ্য বিএনপির আশঙ্কাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কার কোনো কারণ নেই। এখন পর্যন্ত সিলেটে এমন কিছু ঘটেনি যে বিএনপি এ ধরনের কোনো আশঙ্কা করতে পারে।’

আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত কেন্দ্রের যে অবস্থান, তাতে সিলেটে জোরজবরদস্তি বা অন্য কৌশল করে দলীয় প্রার্থীকে জিতিয়ে আনার কোনো নির্দেশনা নেই। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব চাইছে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক প্রচারের পাশাপাশি দলীয় ঐক্যকে সংহত করে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে।

এ লক্ষ্যে দলের মেয়র পদপ্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান জনসংযোগ কর্মসূচি বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি ও তাঁর কর্মী-সমর্থকেরা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। কামরান গতকাল শহরের কুশিঘাট ও কুয়ারপাড় এলাকায় গণসংযোগ করেন। এ সময় তিনি বলেন, বিএনপি এবং তাদের জোটের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব চলছে। এটিকে সামাল দিতে না পেরে তারা সরকারের বিরুদ্ধে অবান্তর কথা বলছে। নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ষড়যন্ত্র করছে। এসব করেও নৌকার বিজয় ঠেকানো যাবে না।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার রাতেই সিদ্ধান্ত হয় যে বিদ্রোহী বদরুজ্জামান প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেবেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ বিএনপির দুই কেন্দ্রীয় নেতা আমানউল্লাহ আমান ও নাজিমউদ্দিন আলম তাঁকে সম্মত করান। এ খবর জানাজানি হয়ে গেলে সকাল থেকেই বদরুজ্জামানের বাসার সামনে পুলিশ আসে। পরে অবস্থান বদলে তিনি শহরের কুমারপাড়ায় আরিফুল হকের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। এরপর তিনি আরিফুল হকের বাসায় গেলে ওই গলিতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ উপস্থিত হয়। একপর্যায়ে পুলিশ বাড়ির সামনের দিকটা ঘেরাও করে বিএনপির নেতাদের গাড়ি তল্লাশি শুরু করে। ছুটে এসে আরিফুল হক এর প্রতিবাদ জানান এবং কোনো নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হলে শহরজুড়ে প্রতিরোধ সৃষ্টি করা হবে বলে পুলিশকে সতর্ক করেন।

উপস্থিত কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোশাররফ হোসেন দাবি করেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতেই তল্লাশি চালানো হচ্ছে। গোপনীয়তার স্বার্থে তা বলা যাচ্ছে না। এখানে হয়রানির যে অভিযোগ মেয়র প্রার্থী করছেন, সেটা ঠিক নয়।

নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর বিনিময়ে বদরুজ্জামান সেলিমকে বহিষ্কার করা সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের পদটি ফিরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। এ সময় বদরুজ্জামানের সঙ্গে তাঁর মা জৈবুন্নেছা ও স্ত্রী হেনা সেলিম, বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী, কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমানউল্লাহ আমান, নাজিমউদ্দিন আলমসহ সিলেটের সকল পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বক্তব্যে আরিফুল হক চৌধুরী পুলিশের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করার অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, একজন প্রার্থী তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। এতে পুলিশের এত মাথাব্যথা কেন?

দলটির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, খুলনা ও গাজীপুরের অভিজ্ঞতা থেকে সিলেটে বিএনপি প্রতিরোধমূলক কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে। ইতিমধ্যে ১০১টি নির্বাচনী কেন্দ্রের জন্য আলাদা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বুধবার রাতে নগরের মিতা কমিউনিটি সেন্টারে ২৭টি ওয়ার্ডের সভাপতি থেকে সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পর্যন্ত নেতাদের নিয়ে বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সিলেটে বিএনপির সাংগঠনিক দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান।

জানা গেছে, রুদ্ধদ্বার এই বৈঠকে নেতাদের এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, যাঁরা পোলিং এজেন্ট হবেন, তাঁদের ভোটকেন্দ্রে শক্ত অবস্থানের মানসিকতা থাকতে হবে।

হজ ও ওমরাহ সম্পাদন পদ্ধতি

হজের নিয়ত: সম্পাদন-প্রক্রিয়া হিসেবে হজ তিন প্রকার-যথা: ইফরাদ, কিরান ও তামাত্তু। শুধু হজের ইহরামের নিয়ত করে তা সম্পন্ন করলে একে ‘ইফরাদ হজ’ বা একক হজ বলা হয়। হজ ও ওমরাহর জন্য একত্রে ইহরামের নিয়ত করে একই ইহরামে তা সম্পন্ন করলে তাকে ‘কিরান হজ’ বা যৌথ হজ বলা হয়। একই সফরে প্রথমে ওমরাহর ইহরামের নিয়ত করে, তা সম্পন্ন করে পুনরায় হজের জন্য ইহরামের নিয়ত করে তা সম্পাদন করাকে ‘তামাত্তু হজ’ সুবিধাজনক হজ বলা হয়।

তামাত্তু হজ: প্রথমে ওমরাহর নিয়তে ইহরাম করতে হবে। ইহরামের জন্য অজু-গোসল করে ইহরামের কাপড় পরে (মাথায় টুপি রেখে) দুই রাকাত সুন্নাতুল ইহরাম নামাজ আদায় করতে হবে। এই নামাজে প্রথম রাকাতে সুরা কাফিরুন ও দ্বিতীয় রাকাতে সুরা ইখলাস পড়া সুন্নত। নামাজের সালাম ফিরিয়ে মাথার টুপি খুলে ওমরাহর নিয়ত করে তালবিয়া পাঠ করুন। তালবিয়া, ‘লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক; লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ান নিমাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।’ এই তালবিয়া চলতে থাকবে কাবাঘর দেখা পর্যন্ত।

ইহরাম ও মিকাত: মক্কায় প্রবেশ করতে ইহরাম করতে হয়। ইহরামের নির্ধারিত সীমানাকে মিকাত বলে। বাংলাদেশ থেকে আমাদের মিকাত হলো ইয়ালামলাম পাহাড়। মদিনা থেকে মিকাত হলো জুলহুলায়ফা নামক স্থান। মক্কা থেকে ওমরাহ করতে চাইলে তার মিকাত হলো তানয়িম, যেখানে আয়িশা (রা.) মসজিদ অবস্থিত অথবা জিরানা নামক জায়গা। ইহরাম ছাড়া মিকাত অতিক্রম করলে ওয়াজিব তরক হয় বিধায় কাফফারা হিসেবে একটি কোরবানি দিতে হয়। মক্কা থেকে হজের ইহরামের জন্য মিকাত প্রযোজ্য নয়।

ওমরাহ সম্পাদন-প্রক্রিয়া: মক্কায় যাওয়ার পর কাবা শরিফের চারদিকে সাতবার প্রদক্ষিণ করলে এক তাওয়াফ সম্পন্ন হয়। তাওয়াফের নিয়ত, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি উরিদু তওয়াফা বাইতিকাল হারাম ফা ইয়াছছিরহু লি ওয়া তাকাব্বাল হু মিন্নি ছাবআতা আশওয়াতিল লিল্লাহি তাআলা আজ্যা ওয়া জাল্লা।’ মহান আল্লাহ তাআলার উদ্দেশে সাত চক্কর। এরপর বলুন, ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ্।’

তাওয়াফ শেষে মাকামে ইবরাহিমে অথবা মসজিদে হারামের যেকোনো জায়গায় দুই রাকাত ওয়াজিবুত তাওয়াফ নামাজ আদায় করতে হয়।

এরপর জমজমের পানি পান করে সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝে সাতবার সাঈ করতে বা দৌড়াতে হবে।

সাঈর নিয়ত: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি উরিদু আন আছ’আ মা বাইনাছ ছফা ওয়াল-মারওয়াতা ছাব’আতা আশওয়াতিন ছা’ইয়া-ল-হাজ্জি/উমরাতি লিল্লাহি তাআলা আজ্জা ওয়া জাল্লা, ইয়া রাব্বাল আলামিন!’ এরপর বলুন, ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ্।’

সাঈ সাফা থেকে শুরু করে মারওয়ায় সমাপ্ত হবে। এরপর নারীরা চুলের অগ্রভাগ থেকে এক ইঞ্চি পরিমাণ কাটবেন; পুরুষেরা চুল ছাঁটবেন বা মাথা মুণ্ডন করবেন। এতে ওমরাহ সম্পন্ন হলো।

হজ সম্পাদন প্রণালি: যেহেতু ৮ থেকে ১৩ জিলহজ মূল হজের সময়, তাই যাঁরা ইহরামে নেই তাঁরা ৭ জিলহজ হজের ইহরাম করবেন। এই ইহরামের তালবিয়া (লাব্বাইক) চলতে থাকবে ১০ জিলহজ শয়তানকে পাথর মারার আগ পর্যন্ত। ইহরাম করে মিনায় যেতে হবে, ৮ জিলহজ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মিনায় আদায় করা সুন্নত। ৯ জিলহজ সকালে আরাফাতে যেতে হবে। ৯ জিলহজ সূর্যাস্তের পর মুজদালিফায় পৌঁছে মাগরিব ও এশার নামাজ
আদায় করতে হবে। মুজদালিফায় রাতযাপন ও এখান থেকে ৭০টি কঙ্কর সংগ্রহ করতে হবে। ১০ জিলহজ সকালে মিনায় গিয়ে বড় শয়তানকে ৭টি পাথর মারতে হবে। পাথর মারার দোয়া, ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার! রাগমান লিশ-শায়তান ওয়া রিদাআন লির-রহমান। আল্লাহুম্মাজ-আলহু হাজ্জাম মাবরুরাওঁ ওয়া জাম্বাম মাগফুরাওঁ ওয়া ছাইয়াম মাশকুরাওঁ ওয়া তিজারাতান লান তাবুর।’ (প্রতি কঙ্কর নিক্ষেপের সময় বিসমিল্লাহ পড়ুন)।

তারপর পশু কোরবানি করতে হবে। এরপর নারীরা চুল কাটবেন, পুরুষেরা চুল ছাঁটবেন বা মাথা মুণ্ডন করবেন। এরপর ১০ থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে স্বাভাবিক পোশাকে তাওয়াফে জিয়ারত করবেন। তারপর ১১ ও ১২ জিলহজ উভয় দিন তিন শয়তানকে ৭টি করে ২১টি পাথর মারতে হবে। এ সময় মিনায় অবস্থান করা সুন্নত। ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগেই মিনা ছাড়তে হবে, তা না হলে ১৩ জিলহজও মিনায় অবস্থান করতে হবে এবং সেদিনও তিন শয়তানকে ৭টি করে ২১টি পাথর ছুড়তে হবে। বিদেশি হাজিরা মক্কা শরিফ থেকে প্রস্থানের আগে বিদায়ী তাওয়াফ করবেন।

ভিন্ন কৌশলে এগোচ্ছে জামায়াত

সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী সাতজন। আওয়ামী লীগের বদরউদ্দিন আহমদ কামরান, বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরী, সিপিবি-বাসদের আবু জাফর, ইসলামী আন্দোলনের মোয়াজ্জেম হোসেন খান, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী বদরুজ্জামান সেলিম, স্বতন্ত্র প্রার্থী এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ও এহসানুল হক তাহের। দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে এহসানুল হক তাহের কোনো দলের নন এবং নিজেকে তরুণসমাজের প্রতিনিধি বলে দাবি করেন। অপরজন এহসানুল মাহবুব জুবায়ের নগর জামায়াতের আমির। আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে তাঁর প্রার্থিতা নিয়ে অনেক বেশি কৌতূহল। নয় বছর ধরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা বিএনপি-জামায়াতকে ‘দুজনে দুজনার’ বলে উপহাস করে আসছে এবং এখনো করছে। অন্য প্রায় সব নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত অভিন্ন নির্বাচনী কৌশল নিয়ে থাকে এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু এবার সিলেটে ব্যতিক্রম দেখলাম। কেন্দ্রীয়ভাবে ২০-দলীয় জোটের বৈঠকে বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের দাবি জানালেও কাজ হয়নি। সিলেটে জামায়াত ভিন্ন কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে। স্থানীয় সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, এখানে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে জামায়াত নেতাদের দ্বন্দ্ব বেশ পুরোনো। এই দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয় যখন মেয়র থাকাকালে আরিফুল হক জামায়াতের মালিকানাধীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজের সীমানা দেয়াল ভেঙে দিয়েছেন সড়ক সম্প্রসারণ করার জন্য। জামায়াতের নেতারা এটিকে ভালোভাবে নেননি।

স্থানীয় বিএনপি নেতারা মনে করেন, সারা দেশে জামায়াত বিএনপির সঙ্গে সদ্ভাব রেখে চললেও সিলেটে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই তাদের বোঝাপড়া বেশি। এমনকি নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ প্রার্থী জামায়াতের সমর্থকদের বেশি ভোট পান। এ ছাড়া দলটি নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে সিলেটের জামায়াতের নেতাদের মালিকানাধীন অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল-ক্লিনিকে আওয়ামী লীগের লোককে ‘উপদেষ্টা’ হিসেবে নিয়েছে। এ নজির শুধু সিলেটে নয়, সারা দেশেই কমবেশি আছে।

এ অবস্থায় সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নেতা নিজেকে মেয়র পদে প্রার্থিতা ঘোষণা করলে স্থানীয় বিএনপির পক্ষ থেকে তা প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো চাপ বা অনুরোধ আসেনি। বরং আলোচনা প্রসঙ্গে বিএনপির একাধিক নেতা বলেছেন, আওয়ামী লীগ আমাদের জামায়াতের দোসর, যুদ্ধাপরাধীদের সহযোগী বলে গালমন্দ করে। এখন সিলেটে স্পষ্ট হয়ে যাক কে কার সহযোগী। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামী এগোচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে দলটি স্বনামে নির্বাচন করতে পারবে না ঠিক, কিন্তু বেনামে নেতাদের অংশ নিতে বাধা নেই। জাতীয় নির্বাচনে তারা যে নিজেদের শক্তি পরীক্ষায় নামতে চায়—তার মহড়াটি সিলেট থেকে শুরু করতে চাইছে মৌলবাদী ধ্যানধারণা পুষ্ট দলটি।

জামায়াতের রাজনৈতিক সংহতির আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় কাউন্সিলর পদে প্রার্থী মনোনয়নে বা সমর্থনে। সিলেটে ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি খুব কম ওয়ার্ডেই একক প্রার্থী দিতে পেরেছে। বেশির ভাগ ওয়ার্ডে দুই দলেরই একাধিক প্রার্থী আছেন। নেতারাও এ নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করতে চান না। কেননা, দল কোনো প্রার্থীকে সমর্থন করলে তাঁর প্রতিপক্ষ ক্ষুব্ধ হবে, যার প্রভাব পড়তে পারে মেয়র নির্বাচনে। এ কারণে দুই দলই ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদটি উন্মুক্ত রেখেছে অথবা রাখতে বাধ্য হয়েছে। আইন অনুযায়ী সিটি নির্বাচন আধা দলীয়, আধা নির্দলীয়। মেয়ররা দলীয়, কাউন্সিলররা নির্দলীয়। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ এর নাম দিয়েছেন ‘দো-আঁশলা।’

বিএনপি ও আওয়ামী লীগের স্ববিরোধী নীতি ও অবস্থানের বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী ১৩টি ওয়ার্ডে একক প্রার্থী দিয়েছে। কতটি ওয়ার্ডে দল জয়ী হবে কিংবা মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী কত ভোট পাবেন, সেই বিবেচনার চেয়েও তাদের কাছে অগ্রাধিকার পেয়েছে নির্বাচনী মাঠে সরব থাকা, প্রার্থিতার সুযোগে দলের নীতি ও আদর্শের কথা ভোটারদের কাছে পৌঁছানো। আওয়ামী লীগ মনে করছে, বিএনপি থেকে জামায়াতকে দূরে রাখতে পারলে তারা লাভবান হবে। আবার সিলেট বিএনপির নেতাদের হিসাব হলো, ওরা আলাদা নির্বাচন করায় এখন আর কেউ তাদের জামায়াতের দোসর বলতে পারবে না। বিএনপির উদারপন্থী নেতারা চান জাতীয়ভাবেও এ সমীকরণ তৈরি হোক।

সাম্প্রতিক নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা ‘ভালো ভোট’ পেয়েছেন। খুলনা ও গাজীপুরে দলীয় প্রার্থীর অবস্থান ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পরই। অনেক বিশ্লেষকের মতে, জামায়াত ও হেফাজতের সঙ্গে সমদূরত্বে থাকা দলটি আগামী নির্বাচনে নতুন ইসলামি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। গরিব শ্রমজীবী মানুষের মধ্যেই এর সমর্থন বেশি। জিন্দাবাজার এলাকায় এক মধ্যবয়সী রিকশাচালককে দেখলাম ইসলামী আন্দোলনের প্রতীক ‘হাতপাখা’ লাগিয়ে রেখেছেন রিকশার সামনেই। তিনি যাত্রী বহনের পাশাপাশি দলের পক্ষে ভোটের প্রচার করছেন। অর্থাৎ জামায়াত ধনীদের ইসলামি দল হলে ইসলামী আন্দোলন গরিবদের ইসলামি দল। তবে নীতি ও আদর্শে দুটিই পশ্চাৎমুখী।

বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা বললেন, সিলেটের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। বরং দলটি বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছে। মেয়র প্রার্থী আরিফুল হকও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন, জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী দিয়েছে, এ নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা নেই। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনপ্রিয়তা পরীক্ষা হয়ে যাক কার কেমন ভোট আছে।

জামায়াতে ইসলামী শুধু সিলেটের কথা চিন্তা করে মেয়র পদে প্রার্থী দিয়েছে, তা নয়। তারা সিলেট নির্বাচনকে নিয়েছে ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে। এখানে সফল হলে অন্যান্য স্থানেও একই কৌশল ব্যবহার করবে। তবে জাতীয়ভাবে এ সমীকরণ কতটা কাজ করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিএনপির নেতারা মনে করেন, আজ তাঁরা জামায়াতে ইসলামীকে ছেড়ে দিলে আওয়ামী লীগ কোলে তুলে নেবে। যেমনটি নিয়েছে সাবেক স্বৈরাচারকে। তাই তাঁরা মিত্রকে শত্রুপক্ষের হাতে তুলে দিতে চাইছেন না। কিন্তু জামায়াতের নিজস্ব রাজনৈতিক ভাবনা আছে। দলীয় রাজনীতিতে আশু লাভের চেয়ে তারা দীর্ঘমেয়াদি লাভের কথাই ভাবে।

এই মুহূর্তে রাজনীতির চেয়েও সারা দেশে জামায়াত নেতাদের মালিকানাধীন যে প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলো রক্ষা করা জরুরি বলে মনে করেন জামায়াতের নেতারা। এ কারণে জাতীয়ভাবে সম্ভব না হলেও স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সদ্ভাব রেখে চলার নীতিও নিয়েছে দলটি।

উল্লেখ্য, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যেমনটি প্রচার করে থাকে, বিএনপি জামায়াতের ‘চিরসখা’ নয়। ১৯৮৬ সালে এরশাদের অধীনে যে নির্বাচন হয়, তাতে অন্যদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী অংশ নেয়। যদিও বিএনপি এ নির্বাচন বর্জন করেছিল। ১৯৯৫-৯৬ সালেও যুদ্ধাপরাধীদের দলটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আন্দোলন করেছিল বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে। অতএব, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই।

খোলনলচে পাল্টে ফেলতে হবে

গল্পটি পুরোনো। চর্বিতচর্বণ মনে হবে কারও কারও। তবু উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারলাম না।

রাজার হাতিশালে হাতি কমে গেছে। ইজ্জত নিয়ে টানাটানি। কেননা পাশের রাজ্যের হাতিশালে অনেক অনেক হাতি। রাজা আদেশ দিলেন, হাতি ধরে আনো, যেখান থেকে পারো।

হুকুম শুনেই কোতোয়াল বেরিয়ে পড়লেন পাইক-বরকন্দাজ নিয়ে। জঙ্গল ঘেরাও করে হাতি ধরার কাজে নেমে গেলেন তাঁরা। বনের মুক্ত হাতি কি হাতিশালার বন্দিজীবন চায়? সব হাতি পড়িমরি করে ছুটছে ধরা পড়ার ভয়ে। চারদিকে ভয়ানক চেঁচামেচি, শোরগোল। এমন সময় দেখা গেল, একটা শিয়ালও দৌড়াচ্ছে। পাশাপাশি দৌড়াতে থাকা একটি হাতি তাকে বলল, ‘শিয়াল ভায়া, ওরা তো হাতি ধরতে এসেছে, তুমি পালাচ্ছ কেন?’ শিয়াল ছুটতে ছুটতেই বলল, ‘ওরা যদি আমাকেও ধরে, তাহলে আমি যে হাতি নই, এটা প্রমাণ করতেই ১২ বছর লেগে যাবে। কে চায় এসব ঝামেলায় পড়তে!’

এটি একটি শিশুতোষ গল্প। সব গল্প তো গাঁজাখুরি নয়! বাস্তবতার সঙ্গে মিলে গেলে গল্পগুলো অনেক দিন আয়ু পায়। এটি সে রকম। আমি রাজদ্রোহী নই। পাইক-পেয়াদাদের বিরুদ্ধেও আমার কোনো অভিযোগ বা বিদ্বেষ নেই। আমাদের সার্বিক বিচারব্যবস্থাটি এমন যে এর মধ্যে একবার ঢুকলে বেরোনো খুবই কঠিন। কোনো কোনো শিশুপার্কে এ ধরনের খেলার ব্যবস্থা থাকে। ঢোকার একটি পথ, বের হওয়ার পথ আরেকটি। কিন্তু সেটি খুঁজে পেতে শিশুরা, এমনকি বড়রাও গলদঘর্ম হয়। আমাদের অনেকেই শিশুকালে সাপলুডু খেলেছি। মনে হবে, এই বুঝি জিতে গেলাম। তারপর হঠাৎ করেই দেখি সামনে অজগরের হাঁ-করা মুখ, নিমেষেই গিলে খেয়ে ফেলল।

‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’, এটি অতি পুরোনো কথা। এখানে বিচার পাওয়া না-পাওয়ার আহাজারি ফুটে উঠেছে। প্রাসঙ্গিক বিষয় দুটি। এক. ন্যায়বিচার পাওয়া যায় না। অর্থাৎ অপরাধী সাজা পায় না, নিরপরাধ ব্যক্তি সাজা ভোগ করে। দুই. বিচারপ্রক্রিয়া এত লম্বা সময় নেয় যে নিরপরাধ প্রমাণ করতে করতেই তার আয়ু ফুরিয়ে যায়।

৯ জুলাই জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের মুখ থেকে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত পেয়েছি। তিনি জানিয়েছেন, চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩৩ লাখ ৯৫ হাজার ৬৪৯। এর মধ্যে নিম্ন আদালতে বিচারাধীন আছে ২৮ লাখ ৯২ হাজার ১৩৭টি মামলা। উচ্চ আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৫ লাখের বেশি (প্রথম আলো, ১০ জুলাই ২০১৮)।

এ দেশে মানুষ বেশি। মামলার সংখ্যাও বেশি। মামলাপ্রিয় জাতি হিসেবে আমাদের খ্যাতি আছে। মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার ব্যাপারেও আমাদের জুড়ি নেই। সাক্ষী ধরে এনে তাকে শিখিয়ে-পড়িয়ে আদালতের কাঠগড়ায় তুলে দেন উকিল-মোক্তাররা। বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্রের গল্প-উপন্যাসে এ রকম উদাহরণ আছে অনেক। উকিলে উকিলে রেষারেষি বা প্রতিযোগিতার কারণেও মামলা চলে ধীরগতিতে। এ এমন এক গ্যাঁড়াকল, একবার যে এর মধ্যে পড়েছে, সে-ই টের পেয়েছে। শান্তিপ্রিয় মানুষ ঝুটঝামেলা এড়াতে চায়। থানা-পুলিশ বা কোর্ট-কাচারির ধারেকাছেও যেতে চায় না। তা না হলে মামলার সংখ্যা আরও বেশি হতে পারত।

অনেকেই বিনা বিচারে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর জেলখানায় আটক থাকেন। মামলা আদালতে গড়ায় না। এ দেশের মামলা তো সাক্ষীনির্ভর। তো সাক্ষী খুঁজে পাওয়া যায় না। হয়তো গণমাধ্যমে একটি সংবাদ পাওয়া গেল, অমুক ব্যক্তি বিনা বিচারে কিংবা বিনা অপরাধে হাজতবাস কিংবা কারাদণ্ড ভোগ করছেন। হয়তো কোনো এনজিও স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে উদ্যোগ নেয়, তাঁকে আইনি সাহায্য দিতে এগিয়ে আসে। হয়তো কোনো বিচারক উদ্যোগী হয়ে বিচারাধীন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির আদেশ দেন; অথবা বলেন, এত বছরের বেশি দিন ধরে যারা হাজতবাস করছে, তাদের ছেড়ে দেওয়া হোক। কিন্তু এগুলো তো হরহামেশা ঘটে না। সহৃদয় বিচারকের নজরে আনতে পারলে তিনি দু-একটা মামলার সুরাহা করে দিতে পারেন। মামলাজট ভাঙতে হলে তো দরকার আমূল সংস্কার। মামলাজট তো এক দিনে হয়নি। শত বছরের জঞ্জাল জমে জমে আজ এ অবস্থা। এক দিনে বা এক বছরে তার নিষ্পত্তি হবে না। কিন্তু শুরু তো করতে হবে।

সাহিত্যের ব্যাপারে উদ্ধৃতি দিতে হলে আমরা অনেকেই রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্রে চলে যাই, কিংবা নজরুল-জীবনানন্দ-সুকান্তর কাছে। রাজনীতির ব্যাপারে আমরা অনেক সময় প্রশ্ন ও উত্তর দুই-ই খুঁজি বঙ্গবন্ধুর ভাষণে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি। দিনটি ছিল শনিবার। জাতীয় সংসদের সপ্তম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন স্পিকার আবদুল মালেক উকিল। সবে চতুর্থ সংশোধনী বিল পাস হয়েছে। সংসদ নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর শেষ ভাষণটি দিচ্ছেন। একপর্যায়ে বললেন:

আজকে বিচার বিভাগের কথা ধরুন। আমরা আজকে একটা কোর্টে বিচারের জন্য গেলে, একটা সিভিল মামলা যদি হয়, আপনি তো উকিল, স্পিকার সাহেব—আল্লাহর মর্জি যদি একটা মামলা সিভিল কোর্টে হয়, তাহলে বিশ বছরেও কি সেই সিভিল মামলা শেষ হয়—বলতে পারেন আমার কাছে? বাপ মারা যাওয়ার সময় বাপ দিয়ে যায় ছেলের কাছে, আর উকিল দিয়ে যায় তার জামাইয়ের কাছে সেই মামলা। আর ক্রিমিনাল কেস হলে লোয়ার কোর্টের মামলা জজকোর্টে—বিচার নাই। জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড। উই হ্যাভ টু মেক আ কমপ্লিট চেঞ্জ এবং সিস্টেম আমাদের পরিবর্তন করতে হবে, যেন ইজিলি মানুষ বিচার পায় এবং সঙ্গে সঙ্গে বিচার পায়।

সমস্ত কিছুর পরিবর্তন দরকার। কলোনিয়াল পাওয়ারের রুল নিয়ে দেশ চলতে পারে না। কলোনিয়াল পাওয়ারে দেশ চলতে পারে না।

নতুন স্বাধীন দেশ, স্বাধীন মতবাদ, স্বাধীনভাবে দেশ শাসন করতে হবে। সেখানে জুডিশিয়াল সিস্টেমের অনেক পরিবর্তন দরকার। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। কোনো কথা শুনব না।

৯ জুলাই সংসদে আইনমন্ত্রী বলেছেন, ‘আইন ও বিচার বিভাগ দেশের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে বিচারকাজ ত্বরান্বিত করতে বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো এবং এজলাস-সংকট নিরসনে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে।’ তিনি আরও বলেছেন, বিচারপতি নিয়োগ দেওয়ার এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির এবং তাঁর জানামতে, ‘আপিল বিভাগে নতুন বিচারপতি নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতি চিন্তাভাবনা করছেন।’

খুব ভালো কথা। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর পেরিয়ে গেছে ৪৩টি বছর। অনেক দিন নাহয় বঙ্গবন্ধুর দল সুস্থির হয়ে বসতে পারেনি। এখন তো তাঁরা ক্ষমতায় আছেন টানা ১০ বছর। এ ব্যাপারে তাঁরা কী কী ‘কার্যকর পদক্ষেপ’ নিয়েছেন, তা জনগণকে জানানো দরকার। এ ক্ষেত্রে ‘দেখছি’, ‘ভাবছি’, ‘চিন্তাভাবনা করছি’, এসব কথার কোনো মানে হয় না। মাঠপর্যায় থেকে শুরু করে আপিল বিভাগ পর্যন্ত সমগ্র বিচারব্যবস্থার খোলনলচে পাল্টে ফেলতে হবে। এ জন্য দরকার অনেক আয়োজন, বিপুল বিনিয়োগ। বাজেটের দিকে তাকালে তো তার ছিটেফোঁটাও নজরে পড়ে না।

বিচারব্যবস্থার সংস্কার শুধু আদালতকেন্দ্রিক হলে চলবে না। এ জন্য দরকার প্রয়োজনীয় আইন-সংস্কার এবং পুলিশ প্রশাসনের দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়ানো। একটি সামগ্রিক সংস্কার পরিকল্পনার আওতায় বিষয়গুলো সমন্বয় করতে হবে। এটাকে দাতা সংস্থার অনুদানে নিছক একটা ‘প্রজেক্ট’ হিসেবে নিলে চলবে না। সরকারের ভেতর থেকেই তাগিদটা আসতে হবে। সঙ্গে থাকতে হবে রাষ্ট্রের প্রবল ইচ্ছাশক্তি। রাষ্ট্র চাইলে সবকিছুই হয়।